রাজকন্যা নয়, ভাগ্যবিড়ম্বিত এক তেজস্বী রাণীর গল্প!

একজন সাহসী, আত্মবিশ্বাসী এবং প্রখর ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন নারীর কথা বলতে গেলে প্রথমেই যার কথা মনে আসবে তিনি হলেন ঝাঁসির রাণী। ঝাঁসি কি রাণী নামেই যিনি সুপরিচিত। বাবা ছিলেন মরুপান্ত তাম্বে এবং মা ভাগীরথী বাঈ তাম্বে। ভারতের কাশীতে জন্ম নেন ঝাঁসির রাণী। জন্মের উনিশ দিন পরে তাঁর নাম দেওয়া হয় ‘মণিকর্ণিকা’। আদর করে ডাক নামে ছোট করে সকলে ডাকতেন ‘মনু’ বলে। মণিকর্ণিকার সঠিক জন্ম সাল নিয়ে রয়েছে প্রচুর বিভ্রান্তি। একদম নির্দিষ্টভাবে তাঁর জন্মসালের খোঁজ কোথাও পাওয়া সম্ভব হয়না এখনও পর্যন্ত। কোথাও লেখা রয়েছে ১৮২৭ তো কোথাও লেখা রয়েছে ১৮২৮! এমনকি ১৮৩৫ সালের উল্লেখও রয়েছে কোথাও! সাল যেটাই হোক না কেন জন্ম তারিখ সকল স্থানে একই, ১৯শে নভেম্বর।

মাতৃছায়া ও মায়ের আদর ভোগ করার সুযোগ খুব কমই পেয়েছেন মণিকর্ণিকা। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে মাত্র চার বছর বয়সেই মাতৃহারা হতে হয় তাঁকে। তবে আদর ও যত্নের কোন কমতি কখনোই ছিল না। বাবা মরুপান্ত তাম্বে তাঁকে পরম যত্ন, মমতা ও ভালোবাসায় বড় করে তুলতে থাকেন। একেবারেই পারিবারিক পরিবেশে বাড়িতে বসেই শিক্ষা গ্রহণ করতে থাকেন মণিকর্ণিকা। তাঁর বাবা বিথুরের পেশোয়া আদালতে কর্মজীবন অতিবাহিত করেছিলেন। যেখানে তিনি তাঁর কন্যাকে একেবারেই নিজের মনের মতো করে গড়ে তুলতে শুরু করেন।

মণিকর্ণিকা ছেলেবেলা থেকেই ছিলেন ভীষণ চঞ্চল ও প্রাণবন্ত। যে কারণে বাবা তাঁর কন্যাকে আদর করে ‘ছাবিলি’ নামেও ডাকতেন। বাবা যেহেতু কোর্টের কাজে ব্যস্ত থাকতে, মণিকর্ণিকা দিনের পুরোভাগ সময় পেতেন নিজের মতো থাকার জন্য। শুধু তাই নয়, তৎকালীন সময়ে অন্য সকল নারীদের তুলনায় অনেক বেশী স্বাধীনতা নিয়ে ও স্বাধীনচেতা ভাবে বড় হতে থাকেন তিনি। একেবারে ছোটবেলা থেকেই আত্মরক্ষামূলক শিক্ষালাভের পাশাপাশি , ঘোড়ার পিঠে চলা, তীর চালনা করা, তলোয়ার চালনা করা এবং মাল্লাখাম্বার শিক্ষা গ্রহণ করতে থাকেন।

মাত্র সাত বছর বয়সে ১৮৪২ সালে ঝাঁসির মহারাজা গঙ্গাধর রাও নিওয়াকার এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন মণিকর্ণিকা। তবে বিয়ের পর মণিকর্ণিকা নিজের নাম পরিবর্তন করেন। দেবী লক্ষ্মীর সাথে মিল রেখে নাম রাখেন লক্ষ্মী বাঈ।

মিষ্টি-মধুর বিবাহিত জীবনে মায়ের কোল আলো করে ১৮৫১ সালে তাদের প্রথম পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। যার নাম রাখা হয় দামোদর রাও। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে নিষ্ঠুর ভাগ্যের কাছে লক্ষ্মী বাঈকে বারবার পরাজিত হতে হয়েছে করুণভাবে। মায়ের কোল খালি করে মাত্র চার দিনের মাথায় পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে তাঁর পুত্রসন্তান। পুত্র হারাবার শোক ভোলার জন্যেই পরবর্তি সময়ে গঙ্গাধর রাও-এর চাচাতো ভাইয়ের ছেলে আনন্দ রাও-কে দত্তক নেন এই দম্পতি। যার নাম বদলে রাখা হয় দামোদর রাও। দুঃখের বিষয় হচ্ছে, পুত্র হারাবার মাত্র দু’বছরের মাথায়  ১৮৫৩ সালের ২১ নভেম্বর স্বামী গঙ্গাধর রাওকেও হারান লক্ষ্মী বাঈ। সাথে ঝাঁসি হারায় তাদের রাজাকে।

আনন্দ রাওকে দত্তক হিসেবে গ্রহণ করার সময়ে রাজা গঙ্গাধর তৎকালিন সময়ের ব্রিটিশ পলিটিক্যাল অফিসারেকে উদ্দেশ্য করে একটি চিঠি পাঠান। যেখানে উল্লেখ ছিল যে তাঁর মৃত্যুর পর দত্তককৃত সন্তানকে যেন পূর্ণ মর্যাদা দিয়ে বড় করে তোলা হয় এবং ঝাঁসির সকল দায়দায়িত্ব তাঁর স্ত্রী লক্ষ্মী বাঈ-এর কাছে সমর্পণ করা হয়। কিন্তু ব্রিটিশ-ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির গভর্নর-জেনারেল লর্ড ডালহৌসী দখল স্বত্ব বিলোপ প্রক্রিয়া (Doctrine of Lapse) প্রয়োগ করেন এবং লক্ষ্মী বাঈকে তাঁর এলাকা ছেড়ে চলে যাবার নির্দেশ দেন। কথিত রয়েছে যে, ডালহৌসী’র এমন কথা শুনে লক্ষ্মী বাঈ উচ্চস্বরে বলে উঠেছিলেন, “আমি কখনই আমার ঝাঁসিকে তাদের কাছে দিয়ে দেবো না।” এভাবেই লক্ষ্মী বাঈ থেকে তিনি হয়ে উঠলেন ঝাঁসির রাণী

১৮৫৪ সালের মার্চে ঝাঁসির রাণীর নামে বার্ষিক ৬০,০০০ ভারতীয় রূপি ভাতা হিসেবে নির্ধারণ করা হয় এবং পুনরায় তাঁকে নির্দেশ দেওয়া হয় ঝাঁসির কেল্লা পরিত্যাগ করার জন্য। ১৮৫৭ সালের ১০ মে ভারতের মিরাটে বিদ্রোহের সূচনা হয়। চারদিকে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে রাইফেলের গুলিতে শূকরের মাংস এবং গরুর চর্বি ব্যবহার করা হচ্ছে। একইসাথে ঘোষণা আসে যে, এই রাইফেল ব্যবহারে যারা অস্বীকৃতি জানাবেন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কথামতো নির্দেশ অমান্যকারী বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া শুরুও করে দেন ব্রিটিশ সৈন্যরা।

১৮৫৮ সালের ২৩ মার্চ স্যার হিউ রোজের নেতৃত্বে ব্রিটিশ সৈন্যরা ঝাঁসি অবরোধ করে। এই অবরোধ প্রতিহত করতে ঝাঁসির রাণী তার বাহিনীর সামনে দাঁড়িয়ে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এমন সংকটপূর্ণ অবস্থায় ঝাঁসি এবং লক্ষ্মী বাঈকে মুক্ত করতে বিশ হাজার সৈনিকের নিজস্ব একটি দল নিয়ে সাহায্যের জন্য এগিয়ে এসেছিলেন অন্যতম বিদ্রোহী নেতা তাতিয়া তোপে। অবরোধবাসী ব্রিটিশ সৈন্যদলে সৈনিকের সংখ্যা ছিল মাত্র ১,৫৪০ জন! এতো স্বল্প সৈনিক থাকা স্বত্ত্বেও তাতিয়া তোপে এবং তাঁর দল ব্রিটিশ সৈন্যদের অবরোধ ভাঙতে একেবারেই ব্যর্থ হন।

ব্রিটিশ সৈনিকেরা ছিলেন খুব ভালো প্রশিক্ষিত। যার ফলে তোপে’র আনাড়ী ও অনভিজ্ঞ সৈনিক দল ৩১ মার্চের ব্রিটিশ আক্রমণের মুখে টিকতে পারেনি। এমনকি লক্ষ্মী বাঈয়ের নিজস্ব বাহিনীও সহ্য করতে পারেনি এই আক্রমণ। আক্রমণের তিন দিন পর ব্রিটিশ সৈন্যদল ঝাঁসির দূর্গের দেয়ালে ফাটল ধরায় এবং ঝাঁসি শহরটি নিজেদের আয়ত্বে নিয়ে নেয়। সৌভাগ্যবশত তার পূর্বেই এক রাতে দূর্গের দেয়াল থেকে সন্তানসহ লাফ দিয়ে লক্ষ্মী বাঈ প্রাণরক্ষা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। প্রচলিত রয়েছে সে সময় তাঁকে ঘিরে রেখেছিল তার নিজস্ব একটি দল, যার অধিকাংশই ছিল নারী সদস্য।

সন্তান আনন্দ রাওকে সাথে নিয়ে নিজের বাহিনী সহযোগে বাজিন্যিক বিনিয়োগের উর্বর ক্ষেত্র কাল্পীতে যান ঝাঁসির রাণী। যেখানে তিনি অন্য সকল বিদ্রোহী বাহিনীর সাথে যোগদান করেন। তাতিয়া তোপের নেতৃত্বেও একটি বিদ্রোহী দল ছিল। এরপর ঝাঁসির রাণী এবং তাতিয়া তোপে একসাথে গোয়ালিয়রের উদ্দেশ্যে রওনা হন। সেখানে তাদের দুইজনের যৌথবাহিনী গোয়ালিয়রের মহারাজার দলকে পরাজিত করে। পরাজিত বাহিনীর সদস্যরা পরবর্তী সময়ে যৌথবাহিনীর সাথে একত্রিত হয়। তারপর ঝাঁসির রাণী এবং তোপের সম্মিলিত বাহিনী মিলে গোয়ালিয়রের কেল্লা দখল করে ফেলে।

সবশেষে ১৭ জুন, ১৮৫৮ সালে ফুলবাগ এলাকার কাছাকাছি কোটাহ-কি সেরাইয় এলাকায় রাজকীয় বাহিনীর সাথে যুদ্ধে খুবই অল্প বয়সে শহীদ হন ঝাঁসির রাণী। এরপরে আরো তিনদিন যাবত যুদ্ধ করে ব্রিটিশ সেনাদল গোয়ালিয়র পুণর্দখল করে ফেলে। যুদ্ধ শেষে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের পক্ষে জেনারেল হিউ রোজ তার প্রতিবেদনে জানিয়েছিলেন, “রাণী তার সহজাত সৌন্দর্য্য, চতুরতা এবং অসাধারণ অধ্যবসায়ের জন্য স্মরণীয় হয়ে আছেন। এছাড়াও, তিনি বিদ্রোহী সকল নেতা-নেত্রীর তুলনায় সবচেয়ে বিপজ্জনক ছিলেন।”

একেবারে ছোটবেলা থেকেই নিজের প্রখর ব্যক্তিত্ব এবং প্রজ্ঞায় উজ্জ্বল ছিলেন ঝাঁসির রাণী। তাঁর মৃত্যুর এতোগুলো বছর পরেও এখনও মানুষ শ্রদ্ধা ও সম্মানের সাথে স্মরণ করেন তেজস্বী ঝাঁসির রাণীকে। যিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কখনোই মাথা নত করেন নি। যুদ্ধ করে, লড়ে নিজের শক্ত হাতে প্রতিপক্ষকে প্রতিহত করে তবেই শহীদ হয়েছেন তিনি। ইতিহাসের পাতায় আজীবনের জন্য স্থান করে নিয়েছেন ভাগ্য বিড়ম্বিত এই রাণী।